সেদিন পর্ব ৮

#সেদিন

– তুমি এই রুমে যে?
– না মানে আন্টি বললেন তাই।
– ঠিক আছে।
ধূসর আর কিছু না বলে চলে গেলো।
রাতে খেতে বসতেই আন্টি জিজ্ঞাসা করলেন,
– কি এখনো তোদের খাইয়ে দিতে হবে?
– না আন্টি আপনাকে শুধু শুধু কষ্ট করতে হবে না।
– আরে কষ্ট কিসের আমি প্রায়ই তো ধূসর আর ধ্রুবকে নিজের হাতে খাওয়াই।
– উহুম মা তুমি আমাকে তখনই নিজ হাতে খাওয়াও যখন আমি ঢাকায় আসি। আচ্ছা ভাবি আপনি বললেন না যে আপনিও কি আমার মতো পড়া চোর কিনা?
– ধ্রুব চুপ কর।
– মা তুমি আমাদের মাঝে কথা বলবে না তো। ভাবি বলেননা আপনি কোথায় পড়েন?
– রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
– ওয়াও গ্রেট আমিও রুয়েটে পড়ি। দুজন তাহলে রাজশাহীতেই বেশ ভালো হয়েছে
আপনার আমার বন্ধুত্বে ভাইয়া বাধা হতে পারবে না। এই আপনি আমার থেকে বড় না ছোট?
– ভাইয়া আমি ১ম বর্ষে আছি।
– ডিয়ার ভাবি আমার ব্যাপারে না জেনেই আমাকে ভাইয়া বলে ফেলছেন কেনো? আমি কি এতোই বুড়ো নাকি? আমিও তো আপনার মতোই ১ম বর্ষে পড়ি।
ধূসর তখন মুখ খুলে বলে,
বুড়োই তো ১ম বার তো অসুস্থতার নাটক করে পরীক্ষাই দিসনি। পড়া চোর কোথাকার! ভালোয় ভালোয় বলছি ভালো করে পড়াশুনা কর না হয় ভবিষৎ অন্ধকার। এমনিতেই তো আমরা মিডেল ক্লাস ফ্যামেলির ছেলে। ভালোভাবে পড়াশুনা করেই বা কি করবি টাকা কামানোটা বেশি প্রয়োজন। খুব শান্ত কণ্ঠে ধূসর কথা গুলো বললো। আমার কান্না এসে যাচ্ছিলো তাই কোনোরকম খাওয়া শেষ না করেই রুমে দৌড়ে চলে আসি। কান্না কোনো ভাবেই সেদিন থামাতে পারছিলাম না তাই বারান্দায় গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেই। তারপরো আমার চোখের অবাধ্য জলগুলো পড়ছিলো। ইচ্ছা হচ্ছিলো চিৎকার করে কাঁদি। চিৎকার প্রায় এসেই যাচ্ছিলো। দরজাটা ধরে কোনো ভাবে দাঁড়িয়ে ভিতর থেকে আসা চিৎকারগুলো বন্ধ করেছিলাম ঠিকই কিন্তু
কান্না থামাতে পারছিলাম না। দুই হাতে দরজা ধরে চোখ বন্ধ করে দরজার সাথে কপাল ঠেকিয়ে সেদিন অনেক অনেক কেঁদে ছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ খোলে দেখি ঠিক আমার অপর পাশে দরজায় ঠিক একই ভঙ্গিতে আমারই মতো দুহাত দিয়ে কপাল লাগিয়ে ধূসর দাঁড়িয়ে আছে। তবে তার চোখ খুলা ছিল আর সে কতক্ষণ পর পর বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। হঠাৎ চোখ খুলে তাকাতেই মনে হয়েছিলো সে যেন ঠিক আমার হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে। আমি তাড়াতাড়ি দূরে সরে যাই। পিছাতে পিছাতে একদম বারান্দার রেলিং ধরে তাকিয়ে একদৃষ্টিতে ধূসরকে দেখতে থাকি। সেদিন আসলে থাই গ্লাসের কারণে আমি ঠিকই ধূসরকে দেখতে পারছিলাম কিন্তু রাত হওয়ায় ধূসর আমাকে দেখছিলো না। সেদিন তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো সে শ্বাস নিতে পারছিলো না। বেশ ফর্সা হওয়ার কারণে ঠিক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো তার নাকের ডগা আর কান একদম লাল হয়েছিলো। অনেকটা শ্বাসকষ্টের রোগীদের মতো ধূসর শ্বাস নিচ্ছিলো আর কাঁপছিলো। কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে ছিলাম এটা মনে নেই তবে সেদিন ধূসরকে দেখে বারবার নির্মলেন্দু গুণের একটা কথা মনে পড়ছিলো।
“আমার জলেই টলমল করে আঁখি
তোমার চোখের অশ্রু কোথায় রাখি”
ধূসর এভাবে অনেকক্ষণ থাকার পর রুম থেকে বেরিয়ে গেলে আমি বারান্দা থেকে উঠে আসি। বিছানায় শুয়ে যেই চোখটা একটু বুজেছি তখনই দরজায় নক করার আওয়াজে চোখ খুলতেই ধূসর বলেছিলো আসতে পারি?
– না মানে সরি। খুব ঘুম পাচ্ছিলো তাই শুয়ে পড়েছিলাম।
– ঠিক আছে তুমি এখানে শুয়ে পড়ো আমি ধ্রুবর সাথে
থাকবো। একটা বই নিতে এসেছিলাম নিয়ে চলে যাচ্ছি।
সকালে ঘুম ভাঙ্গার পরও কিছুক্ষণ শুয়ে ছিলাম। আসলে সেদিন ঘুম থেকে উঠতে মন চাইচ্ছিলো না। হঠাৎ পাশ ফিরতেই বিছানায় আমার পাশে কাউকে দেখতেই চিৎকার করে উঠি। আমার চিৎকার শুনে পাশের মানুষটি ধরফর করে উঠে বসে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি ধূসর।
– আসলে আমি আসতে চাই নি। মা আমাকে পাঠিয়েছে।
– না আসলে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম তো তাই।
দুজনই একসাথে সেদিন সরি বলে ফেলি। তারপর ধূসর আবার বলতে শুরু করে, মায়ের কোনো কথা আমি কোনোদিন ফেলিনি তো তাই। মা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করেছেন। তারপরও আসতে চাইনি মা আমাকে অনেকটা জোর করে ধাক্কিয়ে রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে।
সেদিন বিকেলের দিকে আন্টি আমাকে ধূসরের সাথে মার্কেটে পাঠায়। আমি তো আর কিছুই আনিনি এমনকি কোনো জামা কাপড়ও আনি নি থাকবো কীভাবে তাই বাধ্য হয়েই যেতে হয়েছিলো। সেদিন রিকশায় পাশাপাশি বসতে দ্বিধা বোধ করছিলাম তাই দাঁড়িয়েই ছিলাম। ধূসর রিকশায় বসে আমাকে বলে,
কি হলো আসছো না কেনো?
তাড়াতাড়ি করো সন্ধ্যার আগে ফিরতে হবে। আমি কিছু না বলেই উঠে গেলাম।
– কি হলো এভাবে বসেছো কেনো? পড়ে যাবে তো। আরও এপাশে এসে বসো। কালই তো আমার সাথে রিকশায় করে এসেছো তো আজ এমন করছো কেনো? প্রথম হলে ঠিক ছিলো কিন্তু প্রথম দিন বেশ সাবলীলভাবেই বসেছিলে।
সেদিন উনার উপর বেশ বিরক্ত হয়েছিলাম। আশ্চর্যকথা তখন তো ঘোরের মধ্যে ছিলাম তাই মাথা ঠিক ছিলো না। আসলে সেদিন কিছুই চিন্তা করতে পারছিলাম না। ধূসরের কথা শুনে মনে হয়েছিলো এভাবে কি এতো স্ট্রেটলি কোনো মেয়েকে এমন কথা বলা যায় কিনা। এই ঝাঁকড়ার বউ যে হবে তার খবর আছে, একদম লজ্জা শরম ছাড়া এই ছেলে ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ে আরে আমিই তো তার বউ।
সেদিন রিকশা কিছুটা সামনে এগুতেই ধাক্কা লেগে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম ধূসর তাড়াাড়ি করে আমার হাত ধরে ফেলে আর ঠিক ভাবে বসিয়ে দেয়।
– একদম এভাবে বসে থাকো। এখনই তো পড়ে ব্যাথা পেতে।
চলবে…

লেখক/লেখিকা সম্পর্কে Lamyea Chowdhury

Lamyea Chowdhury

এটাও দেখুন

সেদিন পর্ব ৬

  – দেখো ধূসর মা আমাকে অনেক করে বুঝিয়ে বলেছে যে এখন মনে হচ্ছে আমি …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।