সেদিন পর্ব ৬

 

– দেখো ধূসর মা আমাকে অনেক করে বুঝিয়ে বলেছে যে এখন মনে হচ্ছে আমি তোমার সাথে অনেক সুখী হবো কিন্তু বাস্তবে তা হবে না কখনো। আমি যেভাবে বড় হয়েছি সেখানে তোমার মতো স্ট্রাগল করা ছেলের সাথে বাকি জীবন কষ্ট করে, স্ট্রাগল করে কাটাতে পারবো না।
ধূসর একদিন হয়তোবা তুমি অনেক কিছুই করতে পারবে, গাড়ি বাড়ি সব হবে কিন্তু সেটা কখন হবে আদৌ
হবে কি না তাও জানা নেই।
– আরে স্বাতি গাড়ি বাড়ি দিয়ে কি সুখ পাওয় যায়?
তবুও বলছি তুমি পাশে থেকো আমার আমি তোমার জন্য সব করতে পারবো। এমনতো না যে আমি অশিক্ষিত। তুমি আমার পাশে থাকলে ভাগ্যও ঠিকই আমার সহায় হবে দেখে নিও। আমি জানি তোমার বাবা একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি, অনেক বড় ঘরের মেয়ে কিন্তু তাই বলে তুৃমি এভাবে আমাকে ফিরিয়ে দিও না।
যদি এমনই করার ছিলো তাহলে কেনো আমার সাথে প্রেম করলে?
– দেখো তখন এতো কিছু বুঝে করিনি। বয়স কম ছিলো। বুঝতে পারি নি। এমনকি দুই দিন আগেও বুঝতে
পারিনি। এখন বুঝেছি তাই আর আগের মতো ভুল করছি না। বাস্তববাদী হতে শিখো। আর প্লিজ এখন এখান থেকে যাও। আমি আমার বিয়েতে কোনো ঝামেলা চাই না।
– প্লিজ এমন করো না। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। চলো এখনই এখান থেকে পালিয়ে চলো। আমার স্বপ্ন এভাবে ভেঙে দিও না। তোমার সাথে আমি আমার জীবনের শেষ সূর্যাস্ত দেখতে চাই।
– আপু কে যেন দরজা ধাক্কাচ্ছে এখন কি করবো?
– দাঁড়া আমি দেখছি।
– আপু আমার ভয় করছে কেউ জেনে যায় নি তো?
সেদিন ভয়ে ভয়ে স্বাতি আপু দরজা খুলতেই দিগন্ত ভাইয়া ভিতরে ঢুকে আমাকে একটা চড় দিয়ে বলতে থাকে,
ছিঃ ঝুম তুই এখানে এসে পালানোর প্লেন করছিস। তাই তো তোকে দেখছি এখানে আসার পর থেকে এই ছেলে আর তুই সবসময় একসাথেই থাকছিস। আর স্বাতি আপু তুমি তো বড় তুমি কীভাবে ওদেরকে পালানোর জন্য সাহায্য করছিলে?
আগে আমার কথাটা তো শুন আসলে বলেই স্বাতি আপু হঠাৎ চুপ হয়ে যায় দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি ফুফি দাঁড়িয়ে। ফুফি সেখানে দাঁড়িয়েই প্রশ্ন করে,
– কি হয়েছে এখানে? দিগন্ত ঝুম কাঁদছে কেনো? স্বাতি তুই বল ঘটনাটা কি আসলে? আর এই ছেলেটা কে? কিছুই তো বুঝতে পারছি না। কি হলো চুপ করে আছিস কেনো?
– মা আপু কি বলবে। আপু তো নিজেই ওদের পালাতে সাহায্য করছিলো। আমি বলছি আসলে এখানে পালানোর প্লেন করা হচ্ছিলো।
– কি বলছিস কি?কে কার সাথে পালাবে?
– মা আমি সত্যি বলছি। ঝুম আর এই ডেকোরেটর পালানোর প্লেন করছিলো, স্বাতি আপু ও এদের সাহায্য করছে। ঝুম এখানে আসার পর থেকেই আমি ওকে এই ছেলেটার সাথে অনেকবার দেখেছি।
ঝুমকে অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছিও সে বলেছে এভাবেই কথা বলেছে। তবুও আমার কেনো যেন সন্দেহ হচ্ছিলো। এখন এখানে স্টোর রুমে এসেছিলাম কিছু চেয়ার নিতে এসে দেখি দরজা ভিতর থেকে বন্ধ আর এই ছেলে ভালোবাসার কথা বলছে। এমনকি পালানোর কথাও বলছে।
আমি সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কোনো কথা বের হচ্ছিলো না মুখ থেকে। করুণ চোখে একবার স্বাতি আপুর দিকে তাকাচ্ছিলাম একবার ধূসরের দিকে।
ধূসর আমার চাহনি দেখে আর দিগন্ত ভাইয়ের ভুল বুঝাবুঝি দেখে বলা শুরু করে,
আসলে আপনাদের ভুল হচ্ছে আমি এখানে ঝুমের সঙ্গে না স্বাতির সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। আমি স্বাতির ফ্রেন্ড। ঝুম তো শুধু আমাদের হেল্প করেছে।
– স্বাতি এই ছেলে কি বলছে এসব?
– মা ও আমার ফ্রেন্ড মানে আমরা একসাথে পড়াশুনা করছি।
মানে কি? কি হলো চুপ হয়ে গেলি যে? আমার দিকে তাকিয়ে কথা বল। বাইরে কি দেখছিস বলে ফুফি বাইরে তাকিয়েই স্বাতি আপুর হবু বরের বড় বোনকে দেখতে পায়। তিনি সেদিন খুব শান্ত কণ্ঠে ফুফিকে বলেছিলেন আমি বাবা-মাকে ফোন করছি আন্টি,নিশ্চই তাদের এ ব্যাপারটা জানতে হবে।
সেদিন হলুদ আর বিয়ের তত্ত্ব নিয়ে এসেছিলেন তিনি।
নিজের চোখে এমন একটা ঘটনা দেখে উনার কাছে যা ঠিক মনে হয়েছিলো তিনি তাই করেছিলেন।
সেদিন স্বাতি আপুর শ্বশুড় – শ্বাশুড়ি আসার পরই
আমার বাবা-মা, ফুফা-ফুফু সহ সবাই বিচারকার্য শুরু করে। সেদিন সব কথা শুনে সবাই একদম থমথমে ভাব নিয়ে বসে থাকে,তারপর শ্বাতি আপুর হবু শ্বশুড় স্বাতি আপুকে জিজ্ঞাসা করে, স্বাতি ছেলেটা বলছে সে তোমার সাথে মেডিকেলে পড়ে। কথাটা কি সত্যি?
– সত্যি।
– তাহলে তো ধরে নেওয়া যায় ওরা যা বলছে তা সত্য। মানে ছেলেটা তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে আর তোমার সাথেই তার সম্পর্ক।
– না। ধূসর আমার ফ্র্যান্ড মানে একসাথে আমরা পড়াশুনা করছি। আর কিছু না।
– তুমি বলতে চাচ্ছো ওর সাথে তোমার শুুধু বন্ধুত্ব। তাহলে বন্ধুকে বিয়েতে দাওয়াত দাওনি কেনো? সে কেনো ডেকোরেটর সেজে এখানে এসেছে?
– আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে ঝুম এসএসসি দিয়ে যখন আমাদের এখানে বেড়াতে এসেছিলো তখন আমার মাধ্যমে ওদের পরিচয় হয় আর তখন থেকেই তাদের রিলেশনটা শুরু। কিছুদিন আগে ধূসরের কাছে জানতে পারি ধূসর ঝুমকে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করতে চায় কারণ সে ভয় পাচ্ছে মামা অন্য কোথাও ঝুমের বিয়ে দিতে পারে। ধূসরের প্লেন ছিলো আমার বিয়েতে ঝুম যখন রাজশাহী থেকে ঢাকা আসবে তখন তাকে নিয়ে পালাবে। ধূসর আমাকে প্লেনটা বলার পর আমি পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে আমি আর ধূসরকে আমার বিয়েতে দাওয়াত দেইনি। কিন্তু কোথা থেকে যেন ধূসর জেনে যায় আর সে এখানে চলে আসে। আমি ওদের এমন কাজ করতে বাধা দেওয়ার জন্য এখানে তাদের বোঝাচ্ছিলাম।
আমি সেদিন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলাম স্বাতি আপুর গল্প বানানোর প্রতিভা দেখে। কীভাবে এই বিশ মিনিটের মধে আপু পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবির কাহিনী বানিয়ে ফেলেছে। সেদিন ধূসর আর আমার সাফাই কেউ শুনেনি।
আমাদের কথা শুনে সেদিন ফুফি বাবাকে বলেছিলেন ফরহাদ তোর মেয়েকে বল যেন সে তার দোষ ঢাকতে গিয়ে যে আমার মেয়ের নামে কুৎসা রটনা করছে তা যেন রটানো বন্ধ করে।
– ফুফি আমি সত্যি বলছি।
– তুমি আর একটা কথা বলবে না ঝুম।
– ফুফি আপনিও কিন্তু জানেন আপু আর ধূসর ভাইয়ার সম্পর্কে।
– বেয়ান সাহেবা আপনার ভাইজি কি বলছে? আমাদের তো তাহলে ব্যাপারটা দেখে নিতে হবে। কারণ দেখা যাবে বিয়ের পর যদি আপনার মেয়ে এই ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যায় তাহলে আমাদের মান সম্মান সব যাবে।
– রুমানা মেয়েকে কিছুই শিখাতে পারোনি তুমি। আজ তোমার মেয়ের জন্য আমার মেয়ের বিয়ে ভাঙতে চলেছে।
– দেখুন আপা মুখ সামলে কথা বলুন। আমার মেয়েকে আমি চিনি সে কখনো এমন করতে পারে না। আমার মনে হয় আপনার দেয়া শিক্ষায় কোনো গাফিলতি ছিলো তাই আপনার মেয়ে…
বাবা সেদিন প্রথম মাকে ধমক দিয়েছিলো। মাকে থামিয়ে বাবা বলেছিলো,
তোমার সাহস হয় কি করে যে তুমি আমার আপার সাথে এভাবে কথা বলবে। আপা আমার মায়ের সমতুল্য।
আর আপা ভুল কি বলেছে? আর তোমার মেয়ের যখন এতো বিয়ের শখ হয়েছে তাহলে এখনি বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি। করুক সংসার এই মিডেল ক্লাস ছেলের সাথে।
যখন ভাড়া বাসায় থাকবে, সপ্তায় সপ্তায় নতুন কাপড় পাবে না, এসির হাওয়া পাবে না, লোকাল বাসে ঝুলে ঝুলে মরবে তখন বুঝবে প্রেম করার মজা। দিগন্ত
এখনই কাজি ডাক এখনই এই মেয়েকে বিদায় করবো।
আমার এমন মেয়ের দরকার নেই। ভালোয় ভালোয় বিদায় করে দেই নয়তো পালিয়ে আমার মান সম্মান ডুবাবে। এই ছেলে তোমার পরিবারকে খবর দাও এখনই
বিয়ে করে বউ নিয়ে বিদায় হও।
ধূসর সেদিন অবাক করে দিয়ে বলেছিলো…
চলবে…

লেখক/লেখিকা সম্পর্কে Lamyea Chowdhury

Lamyea Chowdhury

এটাও দেখুন

সেদিন পর্ব ৭

ধূসর সেদিন অবাক করে দিয়ে বলেছিলো আমার পরিবারকে ডাকতে হবে না। ওদের কাছে আমার খুশিই …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।