প্রথম পাতা / গল্প-কাহিনী / সেদিন পর্ব ১০

সেদিন পর্ব ১০

সেদিন কোনোরকম ধূসর আমার পাশের জানলাটা ধরেই বলে,
– ঝুম আমার এটা দিতে মনে নেই ভুলে গিয়েছিলাম।
– কি এটা?
– মোবাইল নয়তো যোগাযোগ হবে কীভাবে। নাও তাড়াতাড়ি ধরো আর পারছিনা দৌড়োতে। কি হলো?
– দিন।
হোস্টেলে আমার রুমমেট ছিলো পুরাই পড়া পাগল। এই মেয়ে সারাক্ষণ টেবিলে বসে থাকতো। আমার বিরক্তি লাগতো জয়াকে দেখে। কথাও তেমন একটা বলতো না। জয়ার কাজ ছিলো ইয়া মোটা এক চশমা লাগিয়ে সারাক্ষণ পড়া। আন্টির জন্য তখন আমারও পড়তে হতো। প্রতিদিন রাতে আন্টির সাথে কথা বলতাম। আন্টিকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম। বেশ ভালোই যাচ্ছিলো দিন। ধ্রুবও প্রতি মাসের প্রথমে এসে আমাকে টাকা দিয়ে যেতো আর কোনো সমস্যা আছে কিনা দেখে যেতো। তবে মা- বাবার জন্য কষ্ট কমও হতো না। মা একদিন এসেওছিলো আমাকে নেওয়ার জন্য আমি যাই নি। মা সহ্য করতে পারছিলো না তাঁর মেয়ে এতো কষ্ট করে হোস্টেলে থাকবে। কিন্তু আমি স্পষ্ট মানা করে দেই। মা আমাকে মামার বাসায় থেকে পড়ার কথাও বলেছিলো আমি সেটাও মানা করি। এরপর থেকে মা প্রায়ই আসতো আমাকে দেখার জন্য, টাকাও দিতে চাইতো আমি নিতাম না। এভাবেই সেদিনগুলোতে আমার জীবন চলতে থাকে। প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় বেশ ভালোই রেজাল্ট করি। তারপর ঈদ চলে আসে। সেবার ঈদের ছুটিতে ঢাকা চলে আসি। বাসায় এসেই আন্টিকে জড়িয়ে সে কি কান্না আমার।
– বোকা মেয়ে কাঁদছিস কেনো? আর কাঁদতে হবে না।
যা রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয় অনেক মজা করবো এবার। ধূসর রুমেই আছে।
রুমের কাছে গিয়ে দেখি দরজা দেওয়া। নক করে আসতে পারি কি না জিজ্ঞাসা করে কোনো সারা শব্দ না পেয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারপর নিজেই দরজা ধাক্কা দিতেই দেখি দরজা খুলে গেছে। ভিতরে ঢুকতেই দেখি ধূসর পড়ার টেবিলে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। প্রায় ছয় সাত মাস পর সেদিন তাকে দেখেছিলাম। এর মধ্যে ওর সাথে কোনোদিন ফোনে কথা পর্যন্ত হয়নি। একটা বই খোলা রেখেই বইয়ের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে।দেখলাম কিছু খোঁচা খোঁচা দাড়িও রেখেছিলো। আর কোনো পরিবর্তন ছিলো না। আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না তাই দাঁড়িয়েই ছিলাম। ডাক দিব কিনা একবার ভেবেছিলাম পরে আর ডাক দেইনি যদি রাগ করেন বা কিছু মনে করেন। হঠাৎ আমার ফোনটা বেজে উঠে আর আওয়াজ শুনে ধূসরের ঘুম ভেঙে যায়। ধূসর সেদিন ঘুম থেকে উঠে আমাকে দেখে বলেছিলো,
– ঝুম!তুমি এসেছো? কখন এলে?
– এইতো মাত্র এলাম।
– আচ্ছা তুমি রেস্ট নাও, আমি আসছি।
ধূসর যাওয়ার পর ফোন হাতে নিয়ে দেখি মা ফোন করেছে। মা সেদিন অনেক করে ঈদের জন্য টাকা পাঠাতে বলেছিল।আমি মানা করে দেই। মা অনেক কান্নাকাটিও করেছিলো তবে আমি পাথর হয়ে ছিলাম। সেদিনগুলোতে
ধূসরের সাথে আমার তেমন একটা কথা হতো না। বলতে গেলে হতোই না। একদিন হবে পনেরো ষোল রোজায় আমি বাসায় একা বসে টিভি দেখছিলাম। আন্টি স্কুলে ছিলেন আর ধ্রুব ভাইয়া, ধূসর কোথায় যেন গিয়েছিল। আন্টি সেদিন আমায় ফোন করে বলেছিলেন শপিংমলে তিনি ওয়েট করছেন যাওয়ার জন্য। আমি যেতে না চাইতেই উনি অনেক রেগে গিয়েছিলেন। আমি বারবার মানা করছিলাম এই শপিং টপিং এখন করা লাগবে না। কিন্তু আন্টি আমার কোনো কথা না শোনেই রাগ দেখিয়ে বলেছিলেন আসবি কিনা বল না হয় বাসায় এসে তোর দাঁত ফেলে দিব। নিরুপায় হয়ে রেডি হয়ে একটা রিকশা নিয়ে রওনা হই। কিন্তু ঢাকা শহরের বিখ্যাত জ্যাম এর কারণে এক ঘণ্টা ধরে আটকে ছিলাম। যারা বাইকে বা সাইকেলে ছিল তারা সাইড দিয়ে চলে যাচ্ছিলো আর আমি রিকশায় বসে বসে ডিম পারছিলাম। একদম বিরক্ত লাগছিলো।হঠাৎ দেখলাম ধূসরও বাইক নিয়ে যাচ্ছিলো। ধ্রুব ভাইয়া ছিলেন তার পিছনে। ধূসর আমাকে সেদিন দেখেনি। ধ্রুব ভাইয়া আমাকে দেখে ধূসরকে বলেছিল,
আরে ভাইয়া দেখো ভাবি না?
– হুম।
– আরে বেচারি জ্যামে আটকে আছে।
– যা তো ওকে গিয়ে বল রিকশাটা ছেড়ে দিতে।
– জো হুকুম মেরে ভাই।
– এই যে ভাবি আসুন আসুন।
– কোথায় যাব?
– শপিং মলে।
– সেখানেই তো যাচ্ছি।
– রিকশা নিয়ে জ্যামেই আটকে থাকতে হবে শপিং মলে পৌঁছোতে পৌঁছোতে ঈদের দিন এসে পড়বে।
– না মানে আপনারা যান আমি যেতে পারবো।
ধ্রুব ভাইয়া সেদিন সেখান থেকেই জোরে জোরে ধূসরকে বলছিলো, ভাবিজান আসতে চাচ্ছেন না। ধূসরও সেদিন বাইকে বসেই জোরে জোরে আমার উদ্দেশ্যে বলেছিল,
চলে এসো ঝুম। এখানে কতক্ষণ বসে থাকবে।
আমিও চিৎকার করে সেদিন উত্তর দিচ্ছিলাম।
– না আমি পারবো, আপনারা চলে যান।
– চলে এসো তো।
– বললাম না সমস্যা নেই।
– আরে বুঝলাম তুমি বাইকে ভয় পাও। আমি আছি তো আমাকে জড়িয়ে ধরে বসো। তারপরও এসো বলছি না হয় দেরি হয়ে যাবে।
আমি সেদিন চোখ ছানাবড়া করে চেয়েছিলাম। ছিঃ ছিঃ উনি রাস্তায় সেদিন কিসব বলেছিলেন। এখনো মনে পড়তেই লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। রাস্তার মানুষ হা হয়ে তাকিয়ে ছিল সেদিন আমার দিকে।
– ভাবি নেমে পড়ুন কথা না বাড়িয়ে ভাইয়ার মুখে কিন্তু লাগাম নেই।আমার থেকে হাজার গুণ বেশি দুষ্টামি করতে পারে ভাইয়া।
– কি হলো ঝুম আসছো না যে আমি তো বললামই….
আমি সেদিন তাড়াতাড়ি করে ধূসরের কথা শেষ হওয়ার আগেই রিকশা থেকে নেমে পড়ি। বাইকের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ধূসর বাইক থেকে নেমে ধ্রুব ভাইয়াকে সামনে বসিয়ে তারপর নিজে বসে আর আমাকে তার পিছনে বসতে বলে। আমি আর কেনো কথা না বাড়িয়ে বাইকে উঠে বসি। সেদিন মেজাজ অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এভাবে কেউ রাস্তায় জোরে জোরে এমন কথা বলে নাকি। ইচ্ছে হচ্ছিলো ওর চুলগুলো টেনে দিতে।
ধ্রুব ভাইয়া বাইক স্টার্ট দিয়েই সেদিন বলেছিলেন,
– কি ব্যাপার ভাইয়া আমি তোমার পিছনে এখানে আসার পর থেকেই লেগে আছি আমাকে বাইকটা চালাতে দিতে। নতুন বাইক কিনে ভাব দেখিয়ে তো ধরতেই দাও নি। এমন কি একটু আগেও কতো রিকুয়েস্ট করলাম দিলে না আর এখন একদম আমাকে ড্রাইভ করতে দিয়ে নিজে নেমে পিছনে বসলে যে।
– এমনি মন চাইলো তাই দিলাম।
– এমনি মন চাইলো না মন ভাবিকে চাইলো?
– বেশি বলছিস ধ্রুব, মার আছে তোর কপালে।
– ভাইয়া তুমি কিন্তু খুব পসিসিভ।
ধূসর সেদিন ধ্রুব ভাইয়ার এই কথায় আর কোনো জবাব দেইনি। তারপর ধ্রুব ভাইয়া গান ধরে,
“এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলো তো”
ধূসর সেদিন বলেছিলো এই পথ যদি না শেষ হয় তবে….
চলবে…

লেখক/লেখিকা সম্পর্কে Lamyea Chowdhury

Lamyea Chowdhury

এটাও দেখুন

সেদিন পর্ব ৬

  – দেখো ধূসর মা আমাকে অনেক করে বুঝিয়ে বলেছে যে এখন মনে হচ্ছে আমি …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।